সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯সত্য ও সুন্দর আগামীর স্বপ্নে...

শহীদদের সমাধি সংরক্ষণ চান মুক্তিযোদ্ধা শামসুল ইসলাম

শহীদদের সমাধি সংরক্ষণ চান মুক্তিযোদ্ধা শামসুল ইসলাম

নুর মোহাম্মদ : বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের সমাধি সংরক্ষণ ও স্মৃতিফলক নির্মাণের স্বপ্ন দেখেন মুক্তিযোদ্ধা শামসুল ইসলাম। নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্য তিনি বলেন, অনেক রক্ত আর প্রাণের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। এখন দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এ কাজ তরুণদের করতে হবে। নিজ কাজের মধ্য থেকে প্রতিদিন ১০ মিনিট দেশের জন্য ভাবতে হবে। তাহলে দেশকে উন্নয়নের শেকড়ে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। তবেই তরুণ প্রজন্ম সার্থকতা লাভ করবে। রোববার (২ ডিসেম্বর) এক সাক্ষাতকারে মুক্তিযোদ্ধা শামসুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে এসব কথা বলেন।

১৯৫২ সালের ১১ জানুয়ারী লক্ষীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ৮নং করপাড়া ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন শামসুল ইসলাম। মাওলানা আব্দুল আজিজ এবং মা নুরুন নহারের ৬ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্য তিনি সবার ছোট। বর্তমানে তিনি লক্ষীপুর পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ড মিয়া বাড়ীর রোডে নিজের মালিকানাধীন ‘মুক্ত বাংলা’ নামের বাড়িতে বসবাস করছেন।

যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি চৌমুহনী কলেজের বি এ পরীক্ষার্থী ছিলাম। বয়স ছিল ১৯ বছর। ১৯৭০’র নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফেলেও পশ্চিম পাকিস্তানিদের তালবাহানা শুরু করে। এদেশের মানুষ তখন বুঝতে পরে এর থেকে উত্তরণের জন্য স্বাধীনতার বিকল্প নেই। তখন পড়া লেখা নয়, স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠি।

স্বাধীনতার এত বছর পরও প্রিয় সাথীদের সমাধিগুলো সংরক্ষণ না করায় হতাশা প্রকাশ করে শামসুল ইসলমা চৌধুরী বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। চৌমুহনী কলেজের তৎকালীন ছাত্রনেতা মাহমুদুর রহমান বেলায়েত, মমিন উল্যা, মোস্তাফিজুর রহমান লুতু ও এম আলাউদ্দনের মত নেতৃবৃন্দের সংস্পর্শ আমাদের আন্দোলিত করে। ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর, জাতীয় পরিষদ এবং ১৭ই ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব আওয়ামীলীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু জনমতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙ্গালি জাতিকে চিরতরে নিঃশেষ করার পরিকল্পনা করে। বঙ্গবন্ধুর বিচক্ষণ নেতৃত্বে বাংলার ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক, সেনা-পুলিশ, ইপিআর-আনসার সকলেই স্বধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে থাকে। ১ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে, আমার কয়েকজন বন্ধুসহ চৌমুহনী থেকে ঢাকা চলে যাই। ২ মার্চ আ স ম আবদুর রব পতাকা উত্তোলন, ৩ মার্চ শাহজাহান সিরাজের স্বাধীনতার ইসতেহার পাঠসহ বাঙ্গালি জাতির মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ ই মার্চের জনসমুদ্রে সোহরাওয়র্দী উদ্যানে উপস্থিত হই। ১০/১১ মার্চের দিকে চৌমুহনী ফিরে আসি। কলেজ বন্ধ ঘোষানা করায় নেতৃবৃন্দের নির্দশে বাড়িতে চলে আসি। এলাকার ছাত্র ও যুব সমাজ আমরা নেতৃবৃন্দের নির্দেশে অপেক্ষায় থাকি এবং ভিতরে ভিতরে যুদ্ধের চুড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে থাকি।

তিনি বলেন, ২৫ শে মার্চ কালো রাতে বর্বর ইয়াহিয়ার নির্দেশে হানাদার বাহিনী ঘুমন্ত বাঙ্গালি জাতির উপর বিশ্বের ইতিহাসে শতাব্দীর নৃশংসতম গণহত্যা চালায়। হত বিহ্বল জাাতি দ্বিগ-বিদ্বিগ ছুটতে থাকে।

এপ্রিল মাস পেরিয়ে মে মাস। ৭নং বশিকপুর ইউনিয়নের আবদুল ওয়াহেদ ভাই এবং চৌমুহনী কলেজের ছাত্রনেতা শাহ আলম চৌধুরীর নির্দশে আমরা পোদ্দার বাজার থেকে ২৫ জনের একটি দল ভারতের উদ্দেশ্য যাত্রা করি। দিনটি ছিল ১১ মে বিকাল বেলা আমার ভাতিজা কাজলকে বলে চলে যাই। বাড়িতে আব্বা জানতো আমি যুদ্ধে যাব; কিন্তু মা হয়তো যেতে দিবেন না তাই বলি নাই। সোমপাড়া এসে তৎকালিন জিন্নাহ কলেজ, বর্তমান কবি নজরুল কলেজের ছাত্রনেতা সিরাজ উদ্দৌলার বাড়িতে সমবেত হয়। সেখানে আরো ৭০-৮০ জনের মত ছাত্র জনতাকে পেয়ে উৎফুল্ল হই। দিন কাটিয়ে রাতের অন্ধকারে আমরা বজরা হয়ে ওয়াছেদপুর আসার পর সকাল হয়ে যায়। ওয়াছেদপুরে চৌমুহনী কলেজের ছাত্র নেতা মনির আহমেদ চৌধুরী আমাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাবস্থা করেন। সন্ধ্যার পর আবার রওয়ানা হই। কানকির হাট পৌঁছানোর আগে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়। একটা বাড়িতে ছোট্ট কাচারি ঘরে আমরা আশ্রয় নিই। পরের দিন সন্ধ্যায় আর্মিদের টহল ফাকি দিয়ে ২জন ২জন করে চৌদ্দগ্রাম সীমান্তপথ পাড়ি দিয়ে আমরা ভারতে প্রবেশ করি। ভারতের ছোত্তাখোলা ট্রানজিট ক্যাম্প ইনচার্জ খাজা আহমেদ ওরফে খাজু মিয়া আমাদের রিসিভ করেন। সেখান থেকে রাজনগর টাকিয়াটিলা ক্যাম্পে ১ সপ্তাহ অবস্থান করি। তারপর উদয়পুর পালাটানা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে চলে যাই। সেখানে প্রায় ১০০০ মানুষের মধ্য লক্ষীপুরের প্রায়৩০০ এর মত যোদ্ধা ছিলেন। ক্যাপ্টেন সুজ্জাত আলী এবং ভারতের ক্যাপ্টেন ভি পি ধর এর তত্ত্বাবধায়নে আমাদের প্রশিক্ষণ শেষ হয়। প্রশিক্ষণে আমাদের গ্রেনেড চার্জ, এস এম জি, এল এম জি, এম জি, এস এল আর, এ ধরনের অস্ত্র চালনায় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভের জন্য আমাদের ক্যপ্টেন জাফর ইমামের নেতৃত্বে ফেনীর সালদা নদী পার হয়ে বেলুনিয়ায় হানাদারদের সাথে যুদ্ধ করি। তার পর জুলাই মাসে আমরা দেশে প্রবেশ করি। গুনবতী নদী পার হওয়ার সময় পা পিছলে আমাদের এক সহযোদ্ধা পড়ে যান। তাৎক্ষণিক তার পিস্তল থেকে ফায়ারিং হয়ে যায়। ওই রেঞ্জের ভেতরে ছিল হানাদারদের ক্যাম্প। মূহুর্তে তারা সজাগ হয়ে যায়। তারপর আমরা নৌকায় নদী পার না হয়ে সাঁতরে নদী পার হই।

এ মুক্তিযোদ্ধা আরো বলেন, বৃহত্তর নোয়াখালীর নেতৃবৃন্দের নির্দেশে আমরা লক্ষীপুর অঞ্চলে চলে আসি। আমাদের যুদ্ধাঞ্চল ছিল, চাটখীল, সোমপাড়া, খীলপাড়া, মল্লিকার দিঘীর পাড়, করপাড়া, লামচর, বদরপুর শ্রীপুর, বশিকপুর, পোদ্দার বাজার, মাঝিরগাঁও, শ্যামগনঞ্জ, নোয়াহাট, সমিতির হাট, রায়পুরসহ বিস্তৃর্ণ এলাকা। সুবেদার লুৎফর রহমান, তৎকালীন বিজয়নগর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ও আওয়ামীলীগ নেতা রফিকুল হায়দার চৌধুরী এবং বিএল এফ নোয়াখালী জেলা অধিনায়ক মামুদুর রহমান বেলায়েত, একরামুল হক, ছাত্রনেতা ও বি এল এফ থানা অধিনায়ক আ ও ম শফী, বি এল এফ থানা সহ-অধিনায়ক জয়নাল আবেদীন আমাদের নেতেৃত্বে ছিলেন।