বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯সত্য ও সুন্দর আগামীর স্বপ্নে...

বাবার কাছে সন্তানের আবেগঘন চিঠি

বাবার কাছে সন্তানের আবেগঘন চিঠি

নিজস্ব প্রতিবেদক : আব্বু, তোমরা কেমন আছো? কতোদিন তোমাদের দেখি না, খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। কোনো চিঠি লিখেও উত্তর পাই না। অনেকদিন তোমরা কেউ আমাকে দেখতে আসো না, চিঠিও লিখ না। আব্বু, আমিতো এখনো বেঁচে আছি। কিভাবে নিজের সন্তানকে ভুলে গেলে? আব্বু, আমার জীবনটা কি আমার ভুলের জন্যই নষ্ট হলো? তুমি কেবল তোমার হিসাবটাই রাখলে, তুমি বলো বার বার আমার চিকিৎসা আর আইন আদালত করে তুমি সর্বশান্ত হয়ে গেছো। চাকরি জীবনে তুমি নানাভাবে বিত্তের পাহাড় গড়ায় ব্যস্ত ছিলে। সে নিয়ে আম্মুর কষ্টও কমছিলো না। আর তুমি বলেছো, আম্মু আমার কষ্টেই অকালে মারা গেছে। কিন্তু কিভাবে আমি মাদকাসক্ত হলাম? তোমাদের উদাসীনতা আর অবহেলা না থাকলে আমরা এ পরিণতি হতো না। ভাইয়া অস্ট্রেলিয়া পড়তে গিয়ে ওখানে সেটেল হলো। তার জন্য তোমারা সব করলে আর আমাকে বুয়েটে ভর্তির পরই টিউশনি ধরতে হলো। এমন হিসেব করে টাকা দিতে যে খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাসা থেকে এটা সেটা সরিয়ে এনে বিক্রি করতে শুরু করি। নানা রকমের সিগারেটের নেশাটা প্রবল মাদকাসক্তিতে রূপ নিলে ক্লাস, পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যায়। যেদিন প্রথম নীলক্ষতে পুলিশ ফাঁড়ি থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেলে সেদিন রাতে বাসায় সবাই মিলে এমন মানসিক নির্যাতন করলে, সহ্য করতে না পেরে সে রাতেই বাড়ি ছাড়লাম। তারপর কেবলই অঘটন। আমার আর সংসারে ফেরা হলো না। ফেরা হলো না সাধারণ জীবনে। আব্বু, বৃষ্টি আমার আদরের ছোট বোন। ওর বিয়ে দিলে আমাকে তোমরা খবরটাও দিলে না। কথাটা মনে হলেই আমার কান্না পায়। আব্বু তুমি জানো, আম্মুর অলঙ্কারের বক্সটা আমি সরিয়েছিলাম। সেজন্য তুমি নাকি দিব্যি নিয়েছিলে আমি মরলেও তুমি ফিরে তাকাবে না। আমি মরণনেশায় আসক্ত হয়েছি। নেশায় আমার সব বিচার বুদ্ধি লুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো। মাদকাসক্তি থেকে কখন যে ড্রাগ ট্রেডিংয়ে জড়িয়ে পড়লাম। একদিন ধরাও পড়ে গেলাম। ট্রেন থেকে নামার পর স্টেশনে পুলিশ ব্যাগ দেখতে চাইলে আমি ব্যাগের চেইন খুলে দিয়ে পেছনে চেয়ে দেখি ওরা কেউ নেই। তারপর ১৩ মাসের বিচারে আমার সাত বছর জেল হলো। আব্বু, তুমি ভালো আইনজীবী দিয়ে চেষ্টা করলে এতো বড় শাস্তি আমার হয়তো হতো না। কিন্তু তুমি চাওনি কুলাঙ্গার সন্তান তোমার সংসারে ফিরে যাক। আব্বু, কি অবাক এ পৃথিবী, সন্তান নষ্ট হয়ে গেলে বাবা-মার স্নেহ মমতাও শুকিয়ে যায়। আব্বু, কাল সারারাত আমি কেঁদেছি। আমাদের সেলে গত সন্ধ্যায় এক নতুন কয়েদি এসেই বলে, ‘চার লম্বর (নম্বর) খুন করে আইলাম।’ রাতে ভয় দেখিয়ে আমাকে দিয়ে তার শরীর পা টিপিয়েছে। আমাকে শব্দ করে কাঁদতেও দেয়নি। এ রকম বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো। আব্বু আমি আর বাঁচতে চাই না। আমি মরে যাবো। আমি মরে গেলে... আব্বু, আমার মরদেহটি তোমরা নিতে আসবে তো? ...তোমার হতভাগ্য সন্তান বিপু। এ চিঠি মাদকাসক্ত কারাবন্দি বিপুর। লিখেছেন তার বাবার কাছে। মঙ্গলবার (২৬ জুন) দুপুরে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে সবাইকে সচেতন করতে চিঠিটি লিফলেট আকারে বিতরণ করা হয়েছে। লক্ষ্মীপুর জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় এ আয়োজন করে। এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে র‌্যালি, আলোচনা সভা ও সাস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মাদকবিরোধী চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মুক্তমঞ্চে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্রপাল। বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার আ সা ম মাহাতাব উদ্দিন। সভায় সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মফিজুল ইসলাম। বক্তব্য রাখেন লক্ষ্মীপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান শরিফ প্রমুখ। এসময় শিক্ষক-শিক্ষার্থী অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার লোকজন উপস্থিত ছিলেন।