শুক্রবার, ৭ অক্টোবর ২০২২সত্য ও সুন্দর আগামীর স্বপ্নে...

কৃষকের স্বপ্নে বৃষ্টির হানা

কৃষকের স্বপ্নে বৃষ্টির হানা

নিজস্ব প্রতিবেদক : উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুর সয়াবিনের রাজধানী হিসাবে খ্যাতি পেয়েছে। এতে লক্ষ্মীপুরের ব্যান্ডিং নামকরণ করা হয়েছে ‘সয়াল্যান্ড’ নামে। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এখানে বাণিজ্যিকভাবে সয়াবিনের চাষ করা হচ্ছে। দেশের মোট উৎপাদনের ৭৫ ভাগ সয়াবিন এখান থেকে যোগান হয়। কম খরচ, অল্প সময়ে অধিক ফসল ও বেশি লাভজনক হওয়ায় সয়াবিন চাষে আগ্রহ বেশি কৃষকদের। কিন্তু গত দুই বছর ধরে ঝড়-বৃষ্টিতে সয়াবিন ঘরে তুলতে না পারায় হোঁচট খাচ্ছে চাষীরা।

এবার বৈশাখের প্রভাবে ঝড়-বৃষ্টিতে উৎপাদিত ৪১ হাজার ২৭০ হেক্টরের মধ্যে ৫৬০ হেক্টর জমির সয়াবিন পঁচে গেছে। এতে ঋণ ও ধার-দেনা করে ফসলবোনা চাষীরা অর্থসংকটের আশঙ্কায় চরম উদ্বিগ্ন রয়েছে। গেল বছর ফসল কাটার আগেই ব্যাপক টানা বৃষ্টিতে চাষীদের সর্বনাশ হয়েছে। চলতি মৌসুমেও ফসল ঘরে তোলার আগে ফের একই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষেত থেকে পানি অপসারণের ব্যবস্থা না থাকায় বিভিন্ন স্থানে পাকা-আধাপাকা সয়াবিন ডুবে গেছে। এতে ফসল পঁচে ক্ষেতের পানি বিবর্ণ হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে হতাশায় পড়েছেন চাষীরা। স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৮-১০দিন ধরে ঝড়-বৃষ্টি চলছে। বজ্রবৃষ্টির কারণে পাঁকা সয়াবিনও ঘরে তোলা যাচ্ছে না। এখনও ফসলের মাঠে অর্ধেকের বেশি সয়াবিন কাঁচা। পেঁকে ওঠার আগেই বৃষ্টির পানিতে ডুবে থাকায় ওই সয়াবিনে পঁচন ধরেছে। পঁচে যাওয়ার ভয়ে অনেকে আবার শুকনো জমির কাঁচা সয়াবিন কেটে নিচ্ছেন। এদিকে বেশিরভাগ কৃষকই জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন। তারা বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিও থেকে বিপুল টাকা ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। ইতিমধ্যে কিছু সয়াবিন পঁচে যাওয়ায় ঋণের টাকা পরিশোধ ভাবনায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শ্রমিক সংকটের কারণে অনেক কৃষকই ক্ষেত থেকে সয়াবিন তুলতে পারেননি। এ অবস্থায় গত কয়েকদিন ধরে কৃষকদের স্কুল-কলেজে পড়–য়া ছেলে-মেয়েরা ফসল তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। রামগতি ও কমলনগরের কৃষকরা জানান, গত দুই মৌসুমে (২০১৬ ও ১৭ সাল) কালবৈশাখীতে ফসল হানির কারণে তাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। স্থানীয় পদ্ধতিতে তারা বীজও সংরক্ষণ করতে পারেননি। চলতি রবি মৌসুম শুরুর দিকে ৭ থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত অসময়ের টানা বৃষ্টিতে জমি পানিতে ডুবে যায়। কাঁদা পানি জমে থাকায় যথাসময়ে তারা জমিতে লাঙ্গল দিতে পারেনি। জমি চাষের উপযোগী হতে এক-দেড় মাস সময় পার হয়ে যায়। মৌসুমের শেষের দিকে এসে তাদেরকে সয়াবিন আবাদ করতে হয়েছে। এতে জেলায় সয়াবিন আবাদের লক্ষমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি। ফের ফসল কাটার আগমুহুর্তে সম্প্রতি ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে লক্ষ্মীপুরের রামগতি, কমলনগর, রায়পুর ও সদর উপজেলার চরাঞ্চলে ৫০ হাজার ৫৭০ হেক্টর জমিতে সয়াবিন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এবার মৌসুমের অসময়ের টানা বৃষ্টির কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। আবাদ হয়েছে ৪১ হাজার ২৭০ হেক্টর। এরমধ্যে সদরে ৫ হাজার ৯৫০, রায়পুরে ৫ হাজার ৫৪০, রামগঞ্জে ৮০, রামগতিতে ১৬ হাজার ৫শ ও কমলনগরে ১৩ হাজার ২শ হেক্টর জমিতে সয়াবিন আবাদ হয়েছে। কমলনগরের চরমার্টিন গ্রামের কলেজছাত্র জুনাইদ আল হাবিব বলেন, সয়াবিনের ক্ষেতগুলো পানিতে ডুবে আছে। বেশিরভাগ ফসলে পঁচন ধরেছে। যার কারণে ক্ষেতের পানি কালো হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে বিভিন্ন রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের সরকারি সহায়তা দিলে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। রায়পুরের দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. নুরুল মমিন বলেন, শ্রমিক সংকটের কারণে অনেক কৃষকই ক্ষেত থেকে সয়াবিন তুলতে পারছে না। অনেকেই আবার ক্ষেতেই সয়াবিন স্তুপ করে রেখেছেন। সয়াবিনে পঁচন রোধ ও বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষার জন্য প্লাস্টিকের কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখার জন্য কৃষকদের জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্মীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বেলাল হোসেন খাঁন বলেন, কালবৈশাখীর প্রভাবে গত কয়েকদিন ধরে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে প্রত্যাশিত ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হবে না। পাকা সয়াবিন দ্রুত কাটতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রসঙ্গত, গত বছর (২০১৭ সালে) ১৯ থেকে ২৪ এপ্রিল টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণে ৫০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির সয়াবিন পানির নিচে ডুবে গেছে। এতে গাছ মরে ও সয়াবিন পঁচে কৃষকদের প্রায় ২৫২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়।

  • Facebook
  • Twitter
  • LinkedIn
  • Print
Copy link
Powered by Social Snap