সোমবার, ২০ মে ২০১৯সত্য ও সুন্দর আগামীর স্বপ্নে...

আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়ম : ভেকু দিয়ে মাটি ভরাট, ড্রেজারে বালু উত্তোলন

আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়ম : ভেকু দিয়ে মাটি ভরাট, ড্রেজারে বালু উত্তোলন

নিজস্ব প্রতিবেদক : লক্ষ্মীপুর সদরে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের মাটি ভরাট কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের সভাপতি ও চর রমনী মোহন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেঘনা নদীর সংযোগ খাল থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন এবং মজুরি ভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ না করে এক্সক্যাভেটর মেশিন (ভেকু) দিয়ে মাটি ভরাটের কাজ করছেন। এতে প্রকল্পের কাজকে ঘিরে সরকারের উদ্দেশ্য ব্যহত হচ্ছে। কর্মবঞ্চিত হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে অসন্তোষ। এদিকে অভিযোগ উঠেছে, পরিকল্পনা ছাড়াই রহস্যজনক কারনে দুর্গম মেঘার চরে এ প্রকল্পটি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়রা এটিকে লুটপাটের প্রকল্প আখ্যায়িত করে বলছেন, ওই চর ও আশপাশ এলাকায় কোন বসতি নেই। সেখানে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায় ট্রলার-নৌকাযোগে যেতে হয়। এছাড়া নাগরিক সুবিধা বলতে কিছুই নেই। অন্যদিকে প্রকল্পটির বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে স্থানীয় এক ব্যক্তি সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের (ডিসি) লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগ সরেজমিন তদন্ত করার জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতে চলমান প্রকল্পের কাজ পরিদর্শনে গিয়ে খোঁদ জেলা প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। সেখানে প্রকল্পটি করার কোন যৌক্তিকতা ছিল না বলেও জানান তিনি। সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প বাস্তবায়নে-দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতায় সদরের চর রমনী মোহন জান্নাতুল মাওয়া আশ্রায়ণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটির ২ লাখ ১৭ হাজার ৮০০ বর্গফুট আয়তনে মাটির কাজের জন্য ৪৯৪.৩৩৩ মেট্টিক টন গম বরাদ্ধ হয়। এর সরকারি মূল্য ১ কোটি ৪৬ লাখ ৮৯ হাজার ৫৯৯ টাকা। এরমধ্যে মূল মাটির কাজে ১৮৮.৬৫৬ এবং সর্দার সুপারভাইজারসহ আনুসাঙ্গিক কাজের জন্য ৩০৫.৬৭৮ মেট্রিক টন গম বরাদ্ধ হয়। প্রতি ঘনমিটার মাটির কাজে ৩.২৭৬ হারে (গম) মজুরি ভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ করার কথা রয়েছে। প্রতি টন গম উত্তোলনে ১২৫ জন শ্রমিক মজুরি দেখানো হয়েছে। সম্প্রতি ওই প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পের মাটির কাজে দৈনিক মজুরি ভিত্তিক কোন শ্রমিকই নিয়োগ করা হয়নি। একটি এক্সক্যাভেটর মেশিন (ভেকু) দিয়ে মাটির কাজ করা হচ্ছে। নিয়মের তোয়াক্কা করছেন না প্রকল্পের চেয়ারম্যান ও ইউপি চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ ছৈয়াল কাজ করছেন। পাশের নদীর সংযোগ খাল থেকে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করছেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, যেখানে মাটির স্তুপ করা হয়েছে, তার পূর্ব ও পশ্চিম পাশে ভেকু দিয়ে পুকুরের মতো খনন করা হয়। এতে যে কোন সময় ওই স্তুপ ভেঙ্গে পড়ার আশংকা রয়েছে। এছাড়া খাল থেকে ড্রেজারে বালু উত্তোলনের কারনে ফসলি জমির দু’পাড়ে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ভয়ে জমির মালিকরা প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না। কাজের সময় নির্ধারণ করা হয় ২২ জানুয়ারি থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ ভাগ কাজ শেষ করা হয়েছে। জেলে ফখরুল ইসলাম ও ইসমাইল জানায়, নদীতে দুই মাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ। এসময়ে তারা কর্মবিমুখ থাকে। তাদের কাজের খুব অভাব থাকে। কিন্তু আশ্রয়ন প্রকল্পে কাজ করতে পারলে, তারা পরিবার পরিজন নিয়ে খেয়ে দিন কাটাতে পারতেন। বর্তমানে ড্রেজার ও ভেকু দিয়ে মাটি কাটার কারনে তারা কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সাইফুল ইসলাম বলেন, ইতোমধ্যে প্রকল্পের সভাপতি ২৫০ মেট্রিক টন গম উত্তোলন করেছেন। নিয়মানুযায়ী কাজ শেষ হলে বাকি বরাদ্দ ছাড় দেওয়া হবে। ওই প্রকল্পের সভাপতি ও চররমনী মোহন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ ছৈয়াল বলেন, দুর্গম চরে নানা সীমাবদ্ধতা থাকায় বাস্তবতার ভিত্তিতে কাজটি করতে হচ্ছে। বাধ্য হয়েই খাল থেকে কিছু বালু উত্তোলন ও ভেকু মেশিন দিয়ে মাটির কাজ করা হচ্ছে। নিয়মানুযায়ী মজুরী দেওয়া সত্ত্বেও চরে কাজ করার মতো শ্রমিকও পাওয়া যায় না। এছাড়া সরকার থেকে ২৯ হাজার টাকা গমের মূল্যে নির্ধারণ থাকলেও আমরা সিন্ডিকেটের কারনে পাই ১৬ হাজার টাকা। এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর অতিরিক্তি জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমি প্রকল্পটি পরিদর্শন করেছি। বাস্তবতার ভিত্তিতে সেখানে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটির কাজ করা হচ্ছে। প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক বরাদ্ধ ছাড় দেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ওই চর ও আশপাশ এলাকায় কোন বসতি নেই। সেখানে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ কোন নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নেই, তারপরও কেন এটি করার হচ্ছে তার কোন যৌক্তিকতা আমি দেখছি না।